একজন পরিচিত মানুষের কণ্ঠে ফোন এসেছে। অপর প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে, “আমি বিপদে পড়েছি, এখনই টাকা পাঠাও।” কণ্ঠটি হুবহু পরিচিত। কিন্তু কয়েক মিনিট পর জানা গেল, সেই ব্যক্তি আসলে এমন কোনো ফোনই করেননি। তাহলে ফোনটি করল কে?
উত্তরটি হতে পারে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো মানুষের মতো কণ্ঠ, ছবি, ভিডিও ও লেখা তৈরি করার ক্ষমতা। কয়েক বছর আগেও কোনো মানুষের কণ্ঠ হুবহু নকল করতে বিশেষ প্রযুক্তি ও দক্ষতার প্রয়োজন হতো। এখন অল্প কিছু অডিও নমুনা ব্যবহার করেও AI-ভিত্তিক প্রযুক্তি কারও কণ্ঠের মতো নতুন বক্তব্য তৈরি করতে পারে।
শুধু কণ্ঠ নয়, মানুষের মুখও নকল করা সম্ভব। একটি ছবিকে ব্যবহার করে এমন ভিডিও তৈরি করা যায় যেখানে কোনো ব্যক্তি এমন কথা বলছেন বা এমন কাজ করছেন, যা তিনি বাস্তবে কখনো করেননি। এই ধরনের কৃত্রিম ভিডিওকে সাধারণভাবে ডিপফেক (Deepfake) বলা হয়।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের সমস্যা। এতদিন আমরা কোনো তথ্যকে সত্য মনে করার ক্ষেত্রে ছবি, ভিডিও কিংবা পরিচিত মানুষের কণ্ঠকে প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করতাম। কিন্তু AI-এর উন্নতির ফলে শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনা তথ্যও সবসময় সত্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, AI শুধু মানুষের পরিচয় নকল করছে না; মানুষের লেখার ধরনও অনুকরণ করতে পারে। একজন মানুষ যেভাবে শব্দ ব্যবহার করেন, বাক্য গঠন করেন বা নির্দিষ্ট ধরনের ভাষায় লিখেন, AI সেই ধরন অনুসরণ করে নতুন লেখা তৈরি করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো লেখা সত্যিই একজন নির্দিষ্ট মানুষ লিখেছেন কি না, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এই প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারও রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠ পুনর্গঠন, প্রতিবন্ধী মানুষের যোগাযোগে সহায়তা, চলচ্চিত্র ও বিনোদন শিল্পে বিশেষ প্রভাব তৈরি এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজে AI-নির্ভর কণ্ঠ ও ছবি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, বরং এর ব্যবহারে। একই প্রযুক্তি যেমন একজন মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে পারে, তেমনি প্রতারণা, গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমও হতে পারে। তাই ভবিষ্যতের ডিজিটাল পৃথিবীতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার জানাই যথেষ্ট নয়; কোন তথ্য সত্য আর কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি—তা যাচাই করার দক্ষতাও প্রয়োজন হবে।
হয়তো এমন একটি সময় আসছে, যখন কোনো ভিডিও দেখে আমরা আর শুধু বলব না, “আমি নিজের চোখে দেখেছি।” বরং প্রশ্ন করব—“আমি যা দেখছি, সেটি কি সত্যিই ঘটেছিল?”
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই প্রশ্নটিই হয়ে উঠতে পারে ডিজিটাল সচেতনতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


